প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার , ৩০ জুলাই ২০২৬ , দুপুর ০২:৫৮।। প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার , ৩১ জুলাই ২০২৬ , রাত ০৩:০৯
রিপোর্টার : মো. মোশারফ হোসাইন

প্রশাসনিক ব্যর্থতায় দেউলিয়া ছাতক সিমেন্ট, বন্ধ কারখানায় ২০০ কোটি টাকার ভূতুড়ে ব্যয়


রিপোর্টার : the investor

দেশের বেসরকারি সিমেন্ট কোম্পানিগুলো যখন নতুন নতুন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তখন চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অপচয় ও অব্যবস্থাপনায় ডুবে হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা টানছে দেশের প্রাচীনতম রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিসিএল)। কারখানাটিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রয় না থাকলেও (Turnover = ৳০) কেবল কাগজ-কলমে বন্ধ কারখানার পেছনেই এক বছরে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা!

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এসব চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে।

যৌথ অডিট ফার্ম এস কে বারুয়া অ্যান্ড কোং এবং কে এম আলম অ্যান্ড কোং কর্তৃক সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ২৪-০৬-২০২৬ তারিখের  প্রতিবেদনের ‘Basis for Qualified Opinion’ অংশে অডিটররা সরাসরি নোট ৫.০২ ও নোট ৬.০০ সহ প্রধান ৫টি খাতের হিসাবগত অসংগতি ও আইনি ব্যত্যয় চিহ্নিত করেছেন। এসব মারাত্মক অনিয়মের কারণে তারা আর্থিক বিবরণীতে 'শর্তযুক্ত মতামত' (Qualified Opinion) প্রদান করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি চরম আর্থিক সংকট ও অস্তিত্বের ঝুঁকিতে (Going Concern Threat) পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন।

খরচের পাহাড়, উৎপাদন শূন্য

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছাতক সিমেন্টের কোনো পণ্য বিক্রি বা রাজস্ব আয় (Turnover) হয়নি। অথচ এই এক বছরে 'বিক্রিত পণ্যের উৎপাদন খরচ' (COGS) দেখানো হয়েছে ১৯৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি (গ্যাস) বাবদ ২১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে শ্রমিকের বিলে; কারখানা চালুই নেই, অথচ অডিট রিপোর্টে 'অন্যান্য ওভারহেড' খাতের অধীনে কেবল 'অস্থায়ী শ্রমিক' (ক্যাজুয়াল লেবার) বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। উৎপাদনহীন কারখানায় এত গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহার ও ভূতুড়ে শ্রমিকের নামে টাকা তোলা প্রশাসনিক তদারকির চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতি নির্দেশ করে।

সরকারি লোকসান বনাম বেসরকারি সাফল্য: কারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা:

সিমেন্ট শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে বসুন্ধরা, শাহ, প্রিমিয়ার বা হাইডেলবার্গের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলো আধুনিক ‘ড্রাই প্রসেস’ ও ভিআরএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভ করছে, সেখানে সিসিসিএল এখনও পুরনো ও অকার্যকর ‘ওয়েট প্রসেস’ প্রযুক্তিতে আটকে ছিল। কারখানাটিকে ‘ড্রাই প্রসেস’-এ রূপান্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বছরের পর বছর কাজ ঝুলে রয়েছে। ফলে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কোটি কোটি টাকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও মেইনটেন্যান্স খরচ জুগিয়ে চালানো হচ্ছে।

অডিট আপত্তি ও অডিটরদের চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট নোটসমূহ:

অডিটররা তাঁদের প্রতিবেদনে মূলত যেসব হিসাব ও নোটের ওপর আপত্তি তুলেছেন: নোট ৫.০২ ও ৬.০০ (অনাদায়ী ৩২২ কোটি টাকা): অডিট রিপোর্টের নোট ৫.০২ অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের পাওনা ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং নোট ৬.০০ অনুযায়ী বন্ধ থাকা কমোড়া লাইমস্টোন মাইনিং প্রজেক্টের (টিএলএমপি) পাওনা ৩২ কোটি ৮ লাখ টাকা (মোট ৩২২ কোটি ২ লাখ টাকা) আর কখনোই আদায় সম্ভব নয়। অডিটরদের আপত্তি সত্ত্বেও এই মৃত পাওনাকে অবলেখন (Write-off) না করে কাগজে-কলমে 'চলতি সম্পদ' হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

নোট ১২.০০ (সি) (ড্যানিডা অনুদানে কৃত্রিম ঋণ): সূচনালগ্ন থেকে 'ড্যানিডা' থেকে প্রাপ্ত ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার অনুদানকে (Grant) অডিটরের বারংবার আপত্তি সত্ত্বেও ভুলভাবে ‘বৈদেশিক ঋণ’ হিসেবে দেখিয়ে দায় বাড়িয়ে রাখা হয়েছে এবং ইক্যুইটি কম দেখানো হয়েছে।

নোট ৭.০২ (ভ্যাট রিবেটের ক্ষতি): কারখানা বন্ধ থাকায় আর কখনোই ফেরত না পাওয়া ২৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার ভ্যাট রিবেটকে ক্ষতি হিসেবে বুক না করে 'অগ্রিম সম্পদ' হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

নোট ১০.০০ (আইনি ও প্রশাসনিক গাফিলতি): কোম্পানি আইনের ৩৬ ধারা লঙ্ঘন করে বহু বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের আপডেটেড তালিকা (Schedule-X) যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) জমা দেয়নি প্রশাসন, যা মূলধনের আইনি ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।

দেউলিয়া হওয়ার পথে সিসিসিএল:

বিপুল পরিমাণ লোকসানের ফলে ছাতক সিমেন্টের মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল পুরোটাই হারিয়ে গেছে। অডিট তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায়। ফলে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইনাস (-) ৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বর্তমানে নিজস্ব আয়ে ঋণ বা সুদ পরিশোধের কোনো সক্ষমতাই প্রতিষ্ঠানটির নেই।

এছাড়াও ‘এম/এস সম্পা অ্যান্ড সানস’ নামের এক ট্রেডার্সকে জামানত ছাড়াই বাকিতে পণ্য দেওয়ার প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে জালিয়াতির মামলা (মামলা নং ১৭/২০২২) চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মত:

আর্থিক ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন প্রযুক্তি আনলেই এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাঁচানো সম্ভব নয়। কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ২০০ কোটি টাকার ভূতুড়ে ব্যয় দেখানো হলো—তা খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ 'ফরেনসিক অডিট' পরিচালনা করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রশাসনিক গাফিলতি ও অপচয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।