রিপোর্টার : the investor বাংলাদেশের অর্থনীতি, পুষ্টি নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানে মৎস্য খাত অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সি-ফুডের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে নেওয়া হচ্ছে সুদূরপ্রসারী নানা উদ্যোগ। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১ম সভায় মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে খাতের রূপান্তর, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি বিশদ কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ও অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির আলোকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় অর্জন, ৬৫ লাখ মেট্রিক টন অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, আইওটি-ভিত্তিক আধুনিক চাষাবাদ, মৎস্য বীমা এবং ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মোঃ খালেদ কনকের সাথে কথা বলেছেন বিশেষ প্রতিবেদক। তাদের সেই বিশেষ আলাপচারিতাটি নিচে তুলে ধরা হলো।
প্রতিবেদক: আসসালামু আলাইকুম, ড. কনক। সম্প্রতি জাতীয় সংসদ ভবনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ১ম সভায় আপনি মৎস্য খাতের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার মৎস্য রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে মূল কৌশল কী হবে?
ড. মোঃ খালেদ কনক: ওয়ালাইকুম আসসালাম। ধন্যবাদ আপনাকে। দেখুন, ২০৩০ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা উচ্চাভিলাষী মনে হলেও এটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবায়নযোগ্য একটি রূপরেখা। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা মূলত মাননিয়ন্ত্রণ, ভ্যালু এডিশন এবং বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণে জোর দিচ্ছি। এর অংশ হিসেবে আমরা ৫ হাজার জিএপি (GAP) সার্টিফায়েড খামার প্রতিষ্ঠা করব এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখতে ৫টি বিভাগীয় আধুনিক কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাব ও কোয়ারেন্টাইন অবকাঠামো গড়ে তুলব। এছাড়া আমাদের ঐতিহ্যবাহী ব্ল্যাক টাইগার ও ভেনামি চিংড়ির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি সি-ফুড ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদক: রপ্তানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নিয়েও বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন প্রাক্কলন যেখানে ৫২.২৩ লাখ মেট্রিক টন, সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছানো কীভাবে সম্ভব হবে?
ড. মোঃ খালেদ কনক: অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে আমরা সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদে জোর দিচ্ছি। আমরা 'প্রিসিশন অ্যাকুয়াকালচার' চালুর উদ্যোগ নিয়েছি, যার আওতায় ৫ হাজার আইওটি (IoT)-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় খামার গড়ে তোলা হবে। এতে পানির গুণাগুণ পরীক্ষা থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় খাদ্য সরবরাহ—সবকিছু ডাটার ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রিত হবে, যা উৎপাদন বাড়াবে এবং অপচয় কমাবে। একই সঙ্গে ২ হাজারের বেশি অবক্ষয়িত জলাশয় পুনরুদ্ধার, উন্মুক্ত জলাশয়ে নিয়মিত পোনা অবমুক্তকরণ এবং বিল নার্সারি ও অভয়াশ্রম সংরক্ষণ জোরদার করার মাধ্যমে আমরা এই বাড়তি উৎপাদন নিশ্চিত করব।
প্রতিবেদক: প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মৎস্যচাষিরা প্রায়ই বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের সুরক্ষায় মৎস্য অধিদপ্তর কী ভাবছে?
ড. মোঃ খালেদ কনক: এটি আমাদের খামারিদের দীর্ঘদিনের একটি দাবি। প্রেজেন্টেশনে আমরা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রস্তাব রেখেছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা বা রোগবালাইয়ের ক্ষতি থেকে প্রান্তিক চাষিদের রক্ষা করতে আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে 'মৎস্য বীমা' চালু করছি। আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত ১ লাখ চাষি ও খামারিকে এই বীমা সুবিধার আওতায় নিয়ে আসা। এর ফলে উদ্যোক্তারা ঝুঁকিহীনভাবে বড় পরিসরে বিনিয়োগে সাহস পাবেন।
প্রতিবেদক: ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আপনাদের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগগুলো কী?
ড. মোঃ খালেদ কনক: ব্লু-ইকোনমিতে আমাদের অপার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের পেলাজিক মাছ আহরণে। আমরা লং-লাইনার টুনা ভেসেল ব্যবহারের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিক মৎস্য আহরণের লাইসেন্স প্রদানের পরিকল্পনা করেছি। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় সী-উইড বা শৈবালভিত্তিক নতুন অর্থনৈতিক খাত বিকশিত করা হচ্ছে। শৈবাল চাষিদের আধুনিক ড্রাইং র্যাক বিতরণ, আগার উৎপাদন ইউনিট স্থাপন এবং ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরির মাধ্যমে নতুন রপ্তানি বাজার সৃষ্টির কাজ পুরোদমে এগোচ্ছে।
প্রতিবেদক: সরকারের অগ্রাধিকারমূলক ১৮০ দিনের কর্মসূচির মধ্যে জলমহাল ও হাওর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের এতে কী সুবিধা হবে?
ড. মোঃ খালেদ কনক: সরকারের নীতি অনুযায়ী আমরা জলমহাল ও উপকূলীয় খালে প্রচলিত ইজারা প্রথা বিলুপ্ত করে প্রকৃত মৎস্যজীবী ও স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণভিত্তিক ব্যবস্থাপনা কায়েম করতে চাই। 'জাল যার, জলা তার'—এই নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে জেলেদের ডিজিটাল নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান জোরদার করা হয়েছে। নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের খাদ্য সহায়তায় ভিজিএফ প্রদান এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত রাখা হবে, যাতে ইলিশ ও সামুদ্রিক সম্পদের প্রজনন নির্বিঘ্ন থাকে।
প্রতিবেদক: এত বড় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আপনারা অধিদপ্তরের জনবল সংকটকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে কী আলোচনা হলো?
ড. মোঃ খালেদ কনক: একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের অনুমোদিত ৬ হাজার ২০১টি পদের মধ্যে ২ হাজার ৩৭২টি পদই বর্তমানে শূন্য। মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও তদারকিতে এই শূন্যতা একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জনাব খায়রুল কবির খোকন এবং কমিটির সদস্যবৃন্দ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। সভায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব জনাব মোঃ দেলোয়ার হোসেনের উপস্থিতিতে আমরা শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ এবং কার্যক্রমের ব্যাপ্তি অনুযায়ী নতুন ১ হাজার ৯১১টি পদ সৃষ্টির যৌক্তিকতা তুলে ধরেছি। কমিটি আমাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
প্রতিবেদক: দেশের তরুণ প্রজন্ম ও উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে মৎস্য খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার বার্তা কী?
ড. মোঃ খালেদ কনক: মৎস্য খাত এখন আর সনাতন কোনো জীবিকা নয়, এটি একটি হাই-টেক ও সম্ভাবনাময় এগ্রি-বিজনেস ইন্ডাস্ট্রি। আমাদের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে ১ লাখ দক্ষ কর্মী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা। যারা প্রযুক্তি ভালোবাসেন, তারা স্মার্ট অ্যাকুয়াকালচার, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সী-উইডের মতো ভ্যালু অ্যাডেড শিল্পে এগিয়ে আসুন। সরকার নীতিমালা, কারিগরি সহায়তা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
প্রতিবেদক: আপনার মূল্যবান সময় ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।
ড. মোঃ খালেদ কনক: আপনাকে এবং আপনার পাঠকদেরও অনেক ধন্যবাদ।