প্রকাশিত : বৃহঃস্পতিবার , ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ , সন্ধ্যা ০৭:১০।। প্রিন্ট এর তারিখঃ শুক্রবার , ২৪ এপ্রিল ২০২৬ , রাত ০৮:২০
রিপোর্টার : নিজস্ব প্রতিবেদক

‎আসন্ন বদলী নোটিশ ঘিরে লাখ টাকার তদবির বাণিজ্য, একই দপ্তরে বছরের পর বছর দায়িত্ব থেকেও নানান টালবাহানা, সাব রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলমের কাছে সব অসম্ভবই যেনো সম্ভব


রিপোর্টার : motiur

১/ ফ্যাসিস্ট আইনমন্ত্রীর খাসলোক।

‎২/ শরীয়তপুর সদরে আইনজীবীর কাছ থেকে চাদা দাবি করা। 

‎৩/ ডেমরা অঞ্চলে নিবন্ধন খাতের সরকারি দপ্তরে পূর্বের অফিস সহকারী শাহজাহানের পরিবর্তে উমেদার সাজুর অর্থের দাপট দিন দিন ভয়াবহ রূপে ধারন করছে।

‎৪/ ম্যানেজ মাস্টার উমেদার সাজুর কাছে প্রতিটি সমস্যার বিকল্প পথ অর্থ দিয়ে বিপদ সারানো, প্রতি মাসে পহেলা সপ্তাহজুড়ে চলে লিস্ট ধরে ধরে সাংবাদিক, প্রশাসন, অফিস খাত, অধিদপ্তরের বড় বড় টেবিলে চা-নাস্তা সম্মানির নামে চলে 'মাসিক অনুপ্রেরণা'। সর্বোচ্চ সম্মানি দুই থেকে তিন, কখনো কখনো পাচ ছাড়িয়ে এক লাফে আট-দশে চলে মাসিক অনুপ্রেরণা।

‎রাজধানী ঢাকার ডেমরা রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মকর্তা, কর্মচারী ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির সখ্যতায় একটি অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয় থেকে দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় প্রতারণা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, স্থানীয় রাজনৈতিক ও নানাবিধ প্রভাব বিস্তার, সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি নানা কৌশলের ফাঁদে ফেলে দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও অনিয়মের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করার মতো সুস্পষ্ট তথ্য উপাত্ত সময়ের কাগজ অনুসন্ধানী টিমের নিকট রয়েছে, উক্ত প্রতিবেদনের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানী গল্প লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

‎কর্মকর্তার নাম মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, একজন সাব-রেজিস্ট্রার। আপন ছোট ভাই গণপূর্তের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার। কর্মজীবনে যেখানে গেছেন সেখানেই বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন। একাধিকবার পত্রপত্রিকার শিরোনাম হয়েছেন আবার পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডুবতেই শিরোনাম থেকে নাম মুছে দিতে সক্ষমও হয়েছেন। গত ১২ বছরে জীবনযাত্রার মান ধাপে ধাপে অগ্রসরের পথে, তবে তা অবৈধ পন্থায়। এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, শতাংশের হিসাব কষে ঘুষ নেন তিনি। অপরদিকে শরীয়তপুর সদর উপজেলায় দায়িত্ব থাকাকালীন সময়ে দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন করার জন্য মিস্টি খরচ বাবদ চাদা দাবি করেছিলেন। তার সিন্ডিকেটকে সুবিধা না দিলে কাজ তো হবেই না, উল্টো দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে দলিল নিবন্ধন করতে সেবাগ্রাহকদের। অবশেষে বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়েই সেবাগ্রাহকদের বাড়ি ফিরতে হয়।

‎সক্রিয় সিন্ডিকেটের মধ্যে মূল ভূমিকায় রয়েছেন অফিস সহকারী শাহজাহান, উমেদার সাজু, টিপসইয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মচারী পাশাপাশি দলিল লেখক সমিতির সদস্যরা। সরকারি ফি পে-অর্ডার আদায়ের বিধান থাকার পাশাপাশি বাড়তি টাকা নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ আদায় করে থাকে এরা। অনুসন্ধানে প্রতিবেদকের কাছ থেকে সরকারি ফি ব্যতীত সাব রেজিস্টারের খরচ, অফিস খরচ দাবি করেন একই দপ্তরের আউটসোর্সিং নিয়োগপ্রাপ্ত একজন নকল নবিশ। শুধু তাই নয়, প্রতিটি হেবা-ঘোষণাপত্র দলিল রেজিস্ট্রির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি'র বাইরেও সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হয়। সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় পেন্সিলের সাংকেতিক চিহ্ন'র ইশারায়। অতিরিক্ত অর্থ না দিলে বিভিন্ন আইনি জটিলতা দেখিয়ে দলিল সম্পাদন বন্ধ রাখার হুমকির পাশাপাশি সামান্য নকল ওঠাতে নির্ধারিত ফির বাইরেও কয়েকগুন বাড়তি টাকা গুনতে হয় সেবাগ্রাহকদের। “কাগজে সমস্যা আছে” বলে ভয় দেখিয়ে নেয়া হয় মোটা অংকের উৎকোচ। জমির সব কাগজ ঠিকঠাক থাকলেও ‘ফ্রেশ জমি’কে ‘ডোবা’, ‘নালা’ বা ‘পতিত’ হিসেবে দেখিয়ে নেয়া হয় বাড়তি ঘুষ। সরকারি নির্ধারিত ফি’র বাইরে দলিলপ্রতি সহকারীর মাধ্যমে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অর্থ। এসব টাকা 'নাস্তা খরচ', ‘ম্যানেজ ফি’ বা ‘সহযোগিতা’র নামে নিয়মিতভাবে তোলা হয়।

‎ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই অফিসে মোটা অঙ্কের ঘুষ ছাড়া কোনো জমির রেজিস্ট্রি হয় না। দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন নেতা, দালাল সিন্ডিকেট ও সাব-রেজিস্ট্রারের কথিত উমেদার, সহকারীর মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। এসব টাকা থেকে একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘ম্যানেজ’ করতে খরচ হলেও অধিকাংশই নিজের কাছে তুলে নেন সাব-রেজিস্ট্রার।

‎২০২৩ সালে শরীয়তপুর সদর উপজেলায় সাব-রেজিস্ট্রার থাকা অবস্থায় মো. জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে আইনজীবীর কাছে বাড়তি টাকা চাদা চাওয়ার অভিযোগ উঠে। সাব-রেজিস্ট্রার ঘুস চাওয়ায় আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ভুঁড়ি ভুঁড়ি অভিযোগ নিয়ে তৎকালীন সময়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হলে পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে ডেমরা সাব রেজিস্টার পদে বদলী আদেশ দেওয়া হয়। ডেমরা অফিসে যোগদানের পরপরই ঘুষ বাণিজ্যের নতুন পন্থা অবলম্বন করে দুর্নীতির রামরাজত্ব তৈরি করে। জাহাঙ্গীর আলমের সাজানো গুছানো 'অফিস সিস্টেম' অনুসারীরা সিস্টেম পলিসি পন্থা অবলম্বন করে ওপেন সিক্রেটে অফিস খরচের নামে চলছে হরিলুট।

‎৫ই আগস্টের পূর্বে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সাথে ছিলো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, জুলাই অভ্যুত্থানের পরপরই জাহাঙ্গীর আলম ভোল পালটে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নাম ভাঙ্গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দাপিয়ে বেড়ানো। ৫ই আগস্টের পূর্বে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হকের ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে বেড়াত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের কালক্রমে জাহাঙ্গীর আলম আইন উপদেষ্টার পরিচয়ে বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস এসোসিয়েশন (বি.আর.এস.এ) কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচন ২০২৫-২৬ কমিটিতে যুগ্ম মহাসচিব-৩ পদে নির্বাচিত হয়। বর্তমানে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের ঘনিষ্ঠজন ও এসোসিয়েশনের গুরুত্বপূর্ণ পদের দোহাই দিয়ে সারাদেশে রেজিস্ট্রেশন পরিবারে ব্যাপক প্রভাব খাটিয়ে বেড়াচ্ছে। ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সবচেয়ে লোভনীয় অফিস হচ্ছে ডেমরা। সূত্র মতে, উচ্চ মহলে তদবির করে ডেমরা অফিসে এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে জাহাঙ্গীর আলম। ক্ষমতার দাপট ভয়াবহ পর্যায়ে রূপ নিয়েছে। ভয়ে কেউ কথা বলছে না।

‎সচিবালয় ঘেরাও করেন জাহাঙ্গীর: ২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাধ্যতামূলক সম্পদ বিবরণী জমা দেয়ার নির্দেশ দেন অন্তর্বর্তী সরকার। এতে সাব-রেজিস্ট্রাররা চরম ক্ষুব্ধ হয়। ওই মাসের ২৭ তারিখ বিকালে ৭০ থেকে ৮০ জন সাব-রেজিস্ট্রার একযোগে আইন মন্ত্রণালয়ের প্রবেশমুখে আন্দোলন করেন। এ সময় তারা উপসচিব (রেজিস্ট্রেশন) আবু সালেহ মো. সালাহউদ্দিন খাঁ ও সিনিয়র সহকারী সচিব মুরাদ জাহান চৌধুরীর কক্ষে গিয়ে তাদের ঘিরে ধরেন। হুমকি-ধামকি দিয়ে সম্পদের ফিরিস্তি ধামাচাপা দিতে নতুন ফন্দি আটে সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব থেকে।

‎মূলত ডেমরা সাব রেজিস্ট্রি অফিস সব সময় কর্মব্যস্ত থাকে। প্রতিদিন সেখানে দুই থেকে আড়াই শ বিভিন্ন শ্রেণির দলিল রেজিস্ট্রি হয়ে থাকে। রেজিস্ট্রি করতে আসার পরই শুরু হয় নানা বিপত্তি। টেবিলে টেবিলে ঘুষ, তবে এ শব্দটির বিকল্প উচ্চারণে বলতে হয় ফিস দিচ্ছি। এমন অভিনব কায়দায় আদায় হচ্ছে ঘুষ। কেরানি, মোহরার, টিসি মোহরার, এক্সট্রা মোহরার —সবাই হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকে কথিত সেই ফিসের জন্য। দিনশেষে সমিতির ফান্ড, কর্মকর্তার ফান্ড, সেরেস্তা ফান্ডে জনগনের কস্টের অর্জিত অর্থ এসকল অসাধু সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিবন্ধন করতে আসা সাধারণেরা বিভিন্ন ভাবে হেনস্তা হয়।

‎এ নিয়ে বিস্তারিত আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হবে।