সম্প্রতি “অ্যামচ্যাম ইনসাইটস: ইকোনমিক অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট আউটলুক” শীর্ষক এক মতবিনিময় সেশনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে অতিথি বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী সদস্য শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। অনুষ্ঠানটি সহায়তা করেছে ফিলিপ মরিস বাংলাদেশ লিমিটেড।
উদ্বোধনী বক্তব্যে অ্যামচ্যাম বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তর পর্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে লজিস্টিক অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা, এনবিআরকে দুটি পৃথক ইউনিটে বিভক্তকরণ, এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন জোরদারের মতো নানা সংস্কার কার্যক্রম চলছে। এসব উদ্যোগ একটি টেকসই ও বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার দৃঢ় অভিপ্রায়কে প্রতিফলিত করে।
তিনি আরও বলেন, অধিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্নীতি দমন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন -“বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত: বর্তমান প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা” বিষয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের আগে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের পথে রয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যদিও প্রবাসী আয় ও রপ্তানি বৃদ্ধি কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। স্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও স্থবির মজুরি প্রবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তিনি আর্থিক ঝুঁকির দিকটি তুলে ধরেন—যেখানে অনাদায়ী ঋণের (এনপিএল) হার ২০ শতাংশেরও বেশি, যা এশিয়ার সর্বোচ্চ, এবং বেসরকারি বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। তিনি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি খাতের প্রশাসন ও ব্যাংকিং খাতের তদারকিতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের আহ্বান জানান, যাতে আস্থা ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়।
ড. খাতুন নীতি-স্থিতিশীলতা, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেন, যা এলডিসি উত্তরণের পরও টেকসই প্রবৃদ্ধি ও সহনশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনায় তিনি রপ্তানি বৈচিত্র্য, জলবায়ু সহনশীলতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানকে দীর্ঘমেয়াদি অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করেন, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অপরিহার্য।
বিডা’র নির্বাহী সদস্য শাহ মোহাম্মদ মাহবুব -বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বলেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি দৃঢ় অবস্থানে আছে এবং ধারাবাহিক সংস্কারের কারণে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি দ্বিগুণ অঙ্ক থেকে এক অঙ্কে নেমে এসেছে, শেয়ারবাজারে ১২.৫% প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) দ্বিগুণ হয়েছে। তিনি ব্যাংকিং, করনীতি ও সম্পদ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কারের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জানান, বিডা সম্প্রতি বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের একত্রে কাজের জন্য স্থান নির্ধারণ, এনবিআরের সঙ্গে মাসিক সমন্বয় সভা এবং বিনিয়োগ সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা টিম গঠনসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (ডব্লিউটিও) মোস্তাফিজুর রহমান -বাংলাদেশের সক্রিয় বাণিজ্য কূটনীতি সম্পর্কে বলেন, জাপান, কোরিয়া ও অন্যান্য এশীয় অংশীদারদের সঙ্গে সিইপিএ/এফটিএ আলোচনার পাশাপাশি এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি সুরক্ষার জন্য ইউএসটিআর-এর সঙ্গে সফল শুল্ক হ্রাস চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সুলতানা ইয়াসমিন তার বক্তব্যে বলেন,, জাতীয় শিল্পনীতি ২০২২ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি এবং এসএমই খাতের উন্নয়নে কাজ চলছে। ওয়ান-স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) ও অনলাইন অনুমোদন ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিজিটালাইজেশন, ইলেকট্রিক ভেহিকল পলিসি ও লজিস্টিকস পলিসির হালনাগাদ প্রণয়নসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এনবিআর-এর দ্বিতীয় সচিব মো. বদরুজ্জামান মুনশি জানান, বাণিজ্য সহজীকরণের জন্য অগ্রিম কর হ্রাস, ফ্রি জোন নীতিমালা প্রণয়ন, ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা, ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ, আমদানি-রপ্তানি হাব এবং বাংলাদেশ সিঙ্গেল উইন্ডো চালুর মাধ্যমে সীমান্ত বাণিজ্য আরও প্রতিযোগিতামূলক করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে চৌধুরী কায়সার মোহাম্মদ রিয়াদ এর পরিচালনায় একটি মুক্ত আলোচনা পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নেন অ্যামচ্যাম প্রেসিডেন্ট সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, ড. ফাহমিদা খাতুন, শাহ মোহাম্মদ মাহবুব এবং সুলতানা ইয়াসমিন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অ্যামচ্যামের সদস্যবৃন্দ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, শিক্ষাবিদ, উন্নয়ন সহযোগী এবং বাণিজ্য, শিল্প, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, এনবিআর ও বিডা-র ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি।