• ঢাকা
  • রবিবার , ২৮ জুন ২০২৬ , রাত ০৩:০৭
ব্রেকিং নিউজ
হোম / উপসম্পাদকীয়
রিপোর্টার : জাকির এইচ. তালুকদার:
ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা আদায়-কৌশলে সংস্কার জরুরি

ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা আদায়-কৌশলে সংস্কার জরুরি

প্রিন্ট ভিউ

দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থেই ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা আদায় পলিসি সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। এইখাতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সময়োপযোগী আদায় পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ রয়েছে যা এনবিআর’কে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে বাধা সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ভ্যাট ফাঁকির কারণে প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভ্যাট ফাঁকির কারণে আনুমানিক ৩০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জরিমানা আদায়ের বর্তমান কৌশল ও আইন সময়োপযোগী নয়। ফলে রাজস্ব আদায়ের হার বাড়ানোর জন্য জরিমানার নিয়মে সংস্কার আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়লেও জরিমানা আদায় করতে দীর্ঘ মামলা ও শুনানি প্রক্রিয়া পার করতে হয়। এক্ষেত্রে সমঝোতার মাধ্যমে ভ্যাট দেওয়ার সহজ আইন থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান আদালতে গিয়ে আপিল করে। ফলে জরিমানা আদায় বছরের পর বছর আটকে থাকে। জরিমানার হার (সর্বোচ্চ ২০০%) কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে কার্যকরভাবে আদায় হয় না। প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন করতে সক্ষম হয়। ভ্যাটের গুরুত্ব ও ক্ষতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে- সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৩৫% আসে ভ্যাট থেকে। ভ্যাট ফাঁকির কারণে যে পরিমাণ ক্ষতি হয় তা দিয়ে প্রতিবছর পদ্মা সেতুর মতো অন্তত দুটি বড় প্রকল্পের ব্যয় মেটানো সম্ভব। ফলে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাট ফাঁকি রোধে শুধু আইন থাকলেই হবে না, জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। প্রযুক্তি নির্ভর জরিমানা ব্যবস্থা চালু না করলে রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে। অন্যদিকে ফাঁকিবাজ প্রতিষ্ঠানে জরিমানার জন্য  প্রতিনিয়তঅভিযান করা জরুরি। যদিও বড় প্রতিষ্ঠান ভেবে নিরীক্ষা ও গোয়েন্দা বিভাগ বেশিরভাগ সময় অভিযানের বিষয়টি এড়িয়ে যায়। অভিজ্ঞ মহল বলছে, বেশিরভাগ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান ভ্যাট ফাঁকির ক্ষেত্রে সূক্ষ্ম ও সহজ কারচুপির সুযোগ নেয়। এই ফাঁকির জন্য এরা পণ্যের আন্ডার প্রাইজ করে থাকে। এক্ষেত্রে বিক্রয় ও ভ্যাটের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কম্পিউটার, ল্যাপটফ ব্যবহার করে। ভ্যাট গোয়েন্দা বিভাগের উচিৎ মার্কেট থেকে পণ্য এনে সেই পণ্যের মূল্য ধরে ভ্যাট নিরীক্ষা ও জরিমানা নির্ধারণ করে ফাঁকি ধরা।  অন্যদিকে ভ্যাট ফাঁকির জরিমানার পর দীর্ঘায়নের সুযোগ দেওয়া উচিৎ নয়। এদের একাউন্ট থেকে অটোমেটিক এডজাস্টমেন্টের মাধ্যমে আদায় কার্যক্রম করা হলে এই জরিমানার বকেয়ার হার সন্তোষজনক হারে কমে যাবে। তবে যে প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে, সঠিক হারে ভ্যাট প্রদান করছে তাদের সম্মানের সাথে উৎসাহ দেওয়া উচিৎ। 

পর্যবেক্ষণ করলে দেখাযাবে, শিল্পায়নের প্রসারের সাথে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বাড়ছে কিন্তু ভ্যাট আদায়ে অসমতা পরিলক্ষিত হচ্ছে আকাশ পাতাল। একই পর্যায়ের দুটি শিল্প-গ্রুপের ভ্যাট প্রদানের চিত্র আকাশ পাতাল পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে। কারণ একটি ফাকি দিচ্ছে অন্যটি দিচ্ছে না। এরপর যখন ফাঁকি ধরা পড়ে জরিমানা করা হয় তা আদায়ের পথে এরা আইনের ফাঁক ফোঁকরে বের হয়ে যায়। এরসাথে বিভিন্ন অসাধু রাজস্বকর্মকর্তার যোগসূত্রও থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অল্প পণ্যে অনেক ভ্যাট আসা ক্যাবলস শিল্পের কথা যদি ধরা হয় তবে দেখা যাবে প্রাণ আরএফএল, ওয়ালটন সহ প্রথম সারির প্রায় ১২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রত্যেকই একএকটা বিশাল পণ্য উৎপাদনকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান। এদের মার্কেট ভলিউম ও প্রতিযোগিতা অনেকটা একই রকম। কিন্তু ভ্যাট দেওয়ার পার্থক্য আকাশ পাতাল। দু'একটা কোম্পানি ছাড়া কেউ সঠিক হারে ভ্যাট দিচ্ছে না। এটা হচ্ছে শুধু সঠিক এসসমেন্টে ভ্যাট ফাঁকির জরিমানা করা হচ্ছে না এবং যা হচ্ছে তাও আদায়ে কার্যকর আইন না থাকার জন্য। এটি সব শিল্প খাতেই হচ্ছে।  

একজন এনবিআর কর্মকর্তা বলেন,“আমরা ই-ভ্যাট চালু করেছি, তবে সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো এর আওতায় আসেনি। জরিমানা আদায় কৌশল সংস্কার না করলে ফাঁকিদাতারা একইভাবে সুযোগ নিতে থাকবে।”

অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা জরিমানা আদায়ের কৌশল সংস্কারের জন্য কয়েকটি সুপারিশ দিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে, - অটোমেটেড জরিমানা ব্যবস্থা: ভ্যাট ফাঁকি ধরা পড়লেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপ ও কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা। ই-ভ্যাট চালান বাধ্যতামূলক: সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল চালান (ঠঅঞ রহাড়রপব) চালু করা। আদালত নির্ভর জটিলতা কমানো: প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তি করা। জরিমানার হার বাস্তবসম্মত করা: বর্তমান ২০০% জরিমানা না দিয়ে ধাপে ধাপে বাস্তব প্রয়োগযোগ্য হার নির্ধারণ। ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (অও) ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে ভ্যাট ফাঁকি শনাক্তকরণ। কঠোর প্রয়োগ: নিয়মিত অডিট ও আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে ফাঁকি রোধ।

রাজস্বকে একটি দেশের উন্নয়নে অক্সিজেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজস্ব যদি সঠিক ভাবে আদায় না হয় তবে দেশ ক্রমে ঋণগ্রস্ত হতে থাকে। এক্ষেত্রে ভ্যাট হলো বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু জরিমানা আদায়ের কৌশল যুগোপযোগী না হওয়ায় প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা হারিয়ে যাচ্ছে। তাই জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর, দ্রুত ও কার্যকর করা ছাড়া ভ্যাট ফাঁকি বন্ধ করা সম্ভব নয়।


মতামত

আরও পড়ুন