স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স কি টেকসই?
প্রিন্ট ভিউ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই একটি নির্ভরযোগ্যস্তম্ভ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, গ্রামীণ ভোগব্যয় সক্রিয়রাখা এবং দারিদ্র্য হ্রাস—সবখানেই রেমিট্যান্সের অবদান সুস্পষ্ট। কিন্তুএকটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে: বর্তমান ধাঁচেরমাইগ্রেশন কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে কি ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স টেকসইরাখা সম্ভব?
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সাম্প্রতিক বছরে বাংলাদেশে বার্ষিকরেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ২২–২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আশেপাশেঘোরাফেরা করছে। এই অঙ্ক বড় হলেও এর কাঠামোগত ভঙ্গুরতা উপেক্ষাকরার সুযোগ নেই। মোট প্রবাসী শ্রমিকের বড় অংশই এখনো লো-স্কিলবা সেমি-স্কিল ক্যাটাগরিতে কর্মরত। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এইধরনের কাজের মজুরি তুলনামূলক কম, অটোমেশন ওরিসেশন-সংবেদনশীল, এবং নীতিগত পরিবর্তনে সবচেয়ে আগে ঝুঁকিরমুখে পড়ে। ফলে কর্মীর সংখ্যা বাড়লেও প্রতি কর্মীর গড় রেমিট্যান্সপ্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে একটি সতর্ক সংকেত।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের রূপান্তর দ্রুতগতির। আইএলও ওওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আগামীএক দশকে হেলথকেয়ার, কেয়ার ইকোনমি, আইটি ও ডিজিটাল সার্ভিস, গ্রিন টেকনোলজি, অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং এবংএজিং-সোসাইটি-সাপোর্ট সার্ভিসে স্কিলড ও হাই-স্কিলড শ্রমের চাহিদাউল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। এসব খাতে কর্মরত একজন স্কিলড কর্মীরমাসিক আয় যেখানে লো-স্কিল কাজের তুলনায় দুই থেকে চার গুণ বেশি, সেখানে তার পাঠানো রেমিট্যান্সও অনুপাতে বেশি ও স্থিতিশীল। অর্থাৎ, কর্মীর সংখ্যা নয়—স্কিল প্রোফাইলই ভবিষ্যৎ রেমিট্যান্সের প্রকৃতনিয়ামক।
এখানেই বাংলাদেশের কৌশলগত ঘাটতি স্পষ্ট হয়। আমরা এখনো“ভলিউম-ড্রিভেন মাইগ্রেশন”-এ নির্ভরশীল—অর্থাৎ বেশি মানুষপাঠানোই সাফল্যের সূচক। অথচ ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতোদেশগুলো “ভ্যালু-ড্রিভেন মাইগ্রেশন”-এ জোর দিয়েছে। ফলাফলহিসেবে দেখা যায়, কম সংখ্যক কর্মী পাঠিয়েও তারা প্রতি কর্মী থেকে বেশিরেমিট্যান্স আয় করছে, একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের গুণগত মান ওসামাজিক সুরক্ষা উন্নত করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, দক্ষতা উন্নয়ন যদিঅভিবাসন নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে না আসে, তাহলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিকপ্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ব—এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও চাপেরমুখে পড়বে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো খরচ ও রিটার্নের অনুপাত। সরকারি ওবেসরকারি গবেষণায় দেখা যায়, একজন লো-স্কিল কর্মী বিদেশে যেতেযে খরচ বহন করে, তার তুলনায় প্রথম কয়েক বছরে প্রকৃত সেভিং ওরেমিট্যান্স রিটার্ন অনেক সময়ই সীমিত থাকে। বিপরীতে, স্কিলড কর্মীরক্ষেত্রে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে তারআয়ের ধারাবাহিকতা ও রিটার্ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অর্থনীতিরভাষায়, স্কিলড মাইগ্রেশন হলো একটি উচ্চ রিটার্ন-অন-ইনভেস্টমেন্ট(ROI) মডেল—যা জাতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মান ও স্থায়িত্বদুটোই বাড়ায়।
সুতরাং নীতিগতভাবে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি।মাইগ্রেশনকে কেবল কর্মসংস্থান রপ্তানির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; একে মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিকমানসম্পন্ন স্কিল সার্টিফিকেশন, টার্গেটেড কান্ট্রি-স্পেসিফিক ট্রেনিং, ভাষা ও সফট স্কিল ডেভেলপমেন্ট, এবং বিদেশি নিয়োগকর্তাদের সঙ্গেইনস্টিটিউশনাল লিংকেজ—এসব না হলে স্কিলড মাইগ্রেশনের কথাকাগজেই থেকে যাবে। একই সঙ্গে, প্রবাসী আয়ের সঠিক বিনিয়োগচ্যানেল তৈরি না হলে রেমিট্যান্সের ম্যাক্রো-ইকোনমিক প্রভাবও সীমিতথাকবে।
আরেকটি প্রায় অপ্রাসঙ্গিক করে রাখা হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়হলো—ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বহু দেশ দ্রুতএজিং সোসাইটিতে পরিণত হচ্ছে। এর অর্থ, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার শুধুশারীরিক শ্রমনির্ভর থাকবে না; বরং কেয়ারগিভিং, নার্সিং, প্যারামেডিক্যাল সার্ভিস, রিহ্যাবিলিটেশন, জেরিয়াট্রিক সাপোর্ট ওডিজিটাল হেলথ–সংক্রান্ত স্কিলের চাহিদা বহুগুণে বাড়বে। এইখাতগুলোতে স্কিলড ও সার্টিফায়েড কর্মীর চাহিদা দীর্ঘমেয়াদি ওতুলনামূলকভাবে রিসেশন-রেজিস্ট্যান্ট। বাংলাদেশ যদি এখনই এইডেমোগ্রাফিক বাস্তবতা মাথায় রেখে স্কিল ম্যাপিং ও ট্রেনিং স্ট্র্যাটেজি তৈরিনা করে, তাহলে আগামী দশকে একটি বড় বৈশ্বিক সুযোগ হাতছাড়াহওয়ার ঝুঁকি থাকবে—যার সরাসরি প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্স প্রবাহে।
একই সঙ্গে, স্কিলড মাইগ্রেশন শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রশ্ন নয়—এটি‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এরও সুযোগ তৈরি করে। স্কিলড কর্মীরা বিদেশে কাজকরে যে জ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রফেশনাল নেটওয়ার্ক অর্জন করে, তা দেশেফেরত এলে উদ্যোক্তা তৈরি, ইনোভেশন ও লোকাল ইন্ডাস্ট্রিআপগ্রেডেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক উন্নয়নশীল দেশএই ব্রেন সার্কুলেশনকে স্ট্র্যাটেজিক অ্যাসেট হিসেবে ব্যবহার করছে। কিন্তুবাংলাদেশে এখনো অভিবাসন নীতি মূলত স্বল্পমেয়াদি আয়ের দিকেঝুঁকে আছে, দীর্ঘমেয়াদি নলেজ ট্রান্সফার বা রিটার্ন মাইগ্রেশনেরকাঠামো দুর্বল। এই জায়গাটিতে সংস্কার না হলে, আমরা হয়তোরেমিট্যান্স পাব—কিন্তু টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের সুযোগ হারাব।
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে—স্কিলড মাইগ্রেশন ছাড়া কিভবিষ্যৎ রেমিট্যান্স টেকসই? ডেটা, বৈশ্বিক ট্রেন্ড এবং তুলনামূলকঅভিজ্ঞতা একসঙ্গেই বলছে: না, টেকসই নয়। পরিমাণের মোহ থেকেবেরিয়ে গুণগত রূপান্তরই এখন একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। স্কিলডমাইগ্রেশন কেবল রেমিট্যান্স বাড়ানোর কৌশল নয়; এটি বাংলাদেশেরবৈশ্বিক অর্থনীতিতে অবস্থান শক্ত করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।এই বিনিয়োগ যত দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে করা যাবে, ভবিষ্যৎরেমিট্যান্স তত বেশি স্থিতিশীল ও মর্যাদাসম্পন্ন হবে।
সাকিফ শামীম: এফএলএমআই, ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপারস্পেশালিটি সেন্টার ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ
মতামত