কাগজে-কলমে ২৫ কোটি টাকা লাভের ঢোল, অথচ ভেতরে আড়াই হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অন্ধকার গর্ত! সাধারণ মানুষকে ‘মুনাফার ঘুমপাড়ানি গান’ শুনিয়ে রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) মূলত দুর্নীতির এক মহাকাব্য রচনা করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসার লোকসানের আড়ালে উইপোকার মতো প্রতিষ্ঠানের মূলধন খেয়ে ফেলার পর, বর্তমানে সংস্থাটির নিট নেতিবাচক রিজার্ভ বা পুঞ্জীভূত লোকসান গিয়ে ঠেকেছে অভাবনীয় ২,৪১২.৫৫ কোটি টাকায়। ফিন্যান্সের ভাষায় ঋণ ও মূলধনের অনুপাত যখন ৩৫ : -২৩৫ এ পৌঁছায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে সরাসরি 'টেকনিক্যালি দেউলিয়া' বলা হয় ।
শুধু হিসাবের কারসাজি বা উইন্ডো ড্রেসিং নয়; ডিজিটাল টিকিট মেশিনের আয় লুকিয়ে ম্যানুয়াল খাতায় হিসাব রাখার মাধ্যমে সরকারি কোষাগারের ২৪.৬২ কোটি টাকার নগদ লুটপাট ], অকেজো ও স্ক্র্যাপ বাসকে আন্তর্জাতিক হিসাব মান লঙ্ঘন করে 'স্থায়ী সম্পদ' হিসেবে দেখানো এবং এই চরম দেউলিয়া দশার মাঝেও মেগা কেনাকাটার নামে নতুন করে ৮২৮ কোটি টাকার ঋণের ফাঁদ তৈরির এক শ্বাসরুদ্ধকর দালিলিক প্রমাণ এবার আমাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের গোপন প্রতিবেদন , স্বাধীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্মের অডিট রিপোর্ট এবং কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)-এর সর্বশেষ নিরীক্ষা নথির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত দীর্ঘ এই ফরেনসিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে বিআরটিসির ভেতরের এক অশুভ 'ত্রিমুখী সিন্ডিকেটের' লুটপাটের ভয়ংকর চিত্র।
১৮ বছরের পুঞ্জীভূত লোকসানের গভীরতা ও বাস্তবতায় চরম বৈপরীত্য ২০০৭-০৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিআরটিসি’র আর্থিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, লোকসানের মাত্রা রৈখিক নয়, বরং জ্যামিতিক হারে ঊর্ধ্বমুখী। এই ১৮ বছরের অখণ্ড খতিয়ানে পরিচালন ব্যয়, অকেজো বাসের অবচয় এবং ঋণের সুদ মিলিয়ে মোট ২,০৫০.১৩ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত ঘাটতি এক ভয়াবহ অকার্যকারিতার দলিল। স্বাধীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস ফার্মের অডিট রিপোর্ট এবং সিএজি-এর সর্বশেষ কমপ্লায়েন্স অডিট অনুযায়ী, বর্তমানে শুধু বাস বিভাগেই পুঞ্জীভূত লোকসানের এই গর্ত প্রায় ২,৪৪৮.৪৬ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে ।
এই দেউলিয়া দশা ধামাচাপা দিতে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ সুকৌশলে ঋণের আসল সুদ (যার পরিমাণ অন্তত ৭৩.৪৪ কোটি টাকা) বাজেটের খাতায় ‘শূন্য’ দেখাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক হিসাব মান লঙ্ঘন করে অকেজো স্ক্র্যাপ বাসগুলোকে ৩৭২.৩৭ কোটি টাকার ‘স্থায়ী সম্পদ’ হিসেবে গণ্য করে নিট মুনাফার বিভ্রান্তি তৈরি করেছে । অর্থাৎ, বিআরটিসি যে মুনাফার গল্প শোনাচ্ছে, তা মূলত ঋণের বোঝা অবজ্ঞা করে এবং মৃত সম্পদকে জীবিত দেখিয়ে সাজানো এক পদ্ধতিগত জালিয়াতি। অর্থনৈতিক সমীক্ষার এই ১৮ বছরের দীর্ঘ উপাত্ত প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ কেবল লোকসানের খাতেই শেষ হচ্ছে না, বরং অডিট আপত্তিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে।
গাড়ির হিসাবেও শিয়ালের অংক বিআরটিসির অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও প্রাক্কলিত বাজেট অনুযায়ী, সংস্থাটির বহরে মোট বাস ও ট্রাকের সংখ্যা ১,৮৭২টি। এর মধ্যে বাসের সংখ্যা ১,৩৫০টি । কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক বাসের মধ্যে কাগজে-কলমে সহস্রাধিক বাস সচল দেখানো হলেও, বাস্তবে নিয়মিত চলাচলকারী বা অনরুট বাসের সংখ্যা মাত্র ১,১২৩টি। অর্থাৎ, সব মিলিয়ে মোট বহরের একটি বড় অংশই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে পড়ে আছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, যে প্রতিষ্ঠানটির বহরের একটি বিশাল অংশ অকেজো বা স্ক্র্যাপ হওয়ার উপক্রম, তারা আন্তর্জাতিক হিসাব মান অমান্য করে অন্তত ৫০টি সম্পূর্ণ অকেজো এবং ৬০টি ভারী মেরামতযোগ্য বাসকে ব্যালেন্স শিটে ৩৭২.৩৭ কোটি টাকার ‘স্থায়ী সম্পদ’ হিসেবে প্রদর্শন করেছে । বাসের মোট সংখ্যার বিপরীতে এই কৃত্রিম সম্পদ মূল্যায়ন কেবল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্থিতিশীলতার মিথ্যা চিত্রই দিচ্ছে না, বরং এটি অকেজো বাসগুলোকে কেন বছরের পর বছর সম্পদের খাতায় টিকিয়ে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
টিকিট বিক্রির টাকা কার পকেটে? হিসাববিজ্ঞানের এই কারসাজির পাশাপাশি সরকারি কোষাগারের নগদ টাকা লুটের এক ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে সিএজি অডিট রিপোর্ট। ডিজিটাল যুগের এই সময়ে বাসে ইলেকট্রনিক টিকিট মেশিন ব্যবহার করা হলেও ফিল্ড ইউনিট বা ডিপোগুলোর সাথে প্রধান কার্যালয়ের কোনো কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার ও ট্র্যাকিং নেই । এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে টিকিট বিক্রির মোট ২৪.৬২ কোটি টাকার নগদ রাজস্ব সরাসরি আত্মসাৎ করা হয়েছে।
সিএজির অফিশিয়াল নথি অনুযায়ী, দুর্নীতির মূল আখড়া ছিল জোয়ারসাহারা বাস ডিপো, যেখানে ইটিএম-এর স্বয়ংক্রিয় ট্রিপ রিপোর্টের আসল আয় লুকিয়ে ম্যানুয়াল বা খাতা-কলমের ক্যাশ বইয়ে কম জমা দেখিয়ে একাই ২২.৯৮ কোটি টাকা গায়েব করা হয়েছে। একইভাবে নরসিংদী বাস ডিপোতেও খাতা-কলমের কারসাজিতে আত্মসাৎ করা হয়েছে ১.৬৩ কোটি টাকা। সিএজি এই ঘটনাকে সাধারণ কোনো অডিট আপত্তি নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই ইটিএম ডাটাবেজ জালিয়াতির মাধ্যমে 'গুরুতর আর্থিক অনিয়ম' এবং 'সরকারি অর্থ আত্মসাৎ' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে । অন্যদিকে, বাসের সংখ্যা এবং ট্রিপ কমলেও তেল কেনার খরচ এক লাফে ৭০ কোটি টাকা এবং মেরামতের খরচ ৪৫.২৯ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে, যা মূলত অকেজো বাসের নামে ভুয়া বিল তুলে কোটি কোটি টাকা পকেটস্থ করার এক নিশ্ছিদ্র বন্দোবস্ত বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ব্ল্যাকহোল তৈরিতে ত্রিমুখী সিন্ডিকেট অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ২,৪১২ কোটি টাকার বিশাল অন্ধকার গহ্বরটি কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, বরং তিনটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ফল:
অনভিজ্ঞ শীর্ষ আমলাতন্ত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেল ও সিএজি অডিট আপত্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিআরটিসির মূল কাঠামোতে স্থায়ী পরিবহন বিশেষজ্ঞদের বদলে প্রেষণে আসা আমলারা শীর্ষ পদে বসেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের গোপন নথি অনুযায়ী, প্রেষণে আসা এই শীর্ষ কর্তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে এবং এদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের প্রতি 'মালিকানাবোধের অভাব' প্রকট, যা সাধারণ কর্মীদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে । রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, চেয়ারম্যান যখন একই সাথে বোর্ডের সভাপতি এবং প্রশাসন ও পরিচালনার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তা স্পষ্টতই একটি 'স্বার্থের সংঘাত'। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' বা জবাবদিহিতা অবশিষ্ট থাকে না।
অযোগ্য হিসাব রক্ষণ সিন্ডিকেট ও পরিকল্পিত ক্রয় জালিয়াতি: অর্থ মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের নথির পাশাপাশি সিএজি-র অফিশিয়াল বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা সংক্রান্ত নথিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিআরটিসির হিসাব ও ভাণ্ডার (স্টোর) বিভাগে কর্মরত কর্মীদের পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন কিংবা আন্তর্জাতিক হিসাব মান সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ নেই। নথির তথ্য বলছে, আইন অনুযায়ী অর্থবছর শুরুর আগে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রস্তুতের নিয়ম থাকলেও বিআরটিসি তা বছরের পর বছর লঙ্ঘন করে আসছে। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, প্রধান কার্যালয়ের সাথে ফিল্ড ইউনিট বা ডিপোগুলোর কেনাকাটার কোনো কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ বা সফটওয়্যার নেই । সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অযোগ্যতা ও কেন্দ্রীয় সফটওয়্যার না রাখা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত। এর মূল লক্ষ্যই হলো—যাতে ওপরের নির্দেশে যেকোনো ভুয়া বিল, তেলের ভুয়া ভাউচার কিংবা স্ক্র্যাপ বাসের অবচয় ফাঁদ হিসাব সহজেই কোনো কেন্দ্রীয় ট্র্যাকিং ও আইনি বাধা ছাড়া পাস করিয়ে নেওয়া যায়।
লিজ গ্রহীতা ও ভেন্ডর চক্র: প্রধান কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন দোকান, পাম্প এবং ফিলিং স্টেশনগুলো বছরের পর বছর ইজারা ও রয়্যালটির কোটি কোটি টাকা আটকে রেখেছে। খোদ সিএজি অডিট রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, কল্যাণপুর বাস ডিপোতেই কাঁচাবাজার ইজারা, দোকান ও কোয়ার্টার ভাড়া বাবদ ৯০.২২ লক্ষ টাকা এবং জোয়ারসাহারা ডিপোতে দোকান ও জমি ভাড়া বাবদ ৫৯.৫১ লক্ষ টাকা সরকারি রাজস্ব বকেয়া পড়ে আছে । সবচেয়ে বড় জালিয়াতি মিলেছে প্রধান কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন 'মেসার্স ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন'-এর কাছে, যার একক বকেয়ার পরিমাণই প্রায় ১.৩৩ কোটি টাকা। চুক্তির শর্ত ভেঙে বছরের পর বছর এই বিপুল টাকা আটকে রাখা হলেও বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা আদায়ের জন্য কোনো কার্যকর আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, যা সরকারি আর্থিক বিধিমালার পরিপন্থী ।
দেউলিয়া দশার মাঝেই ৮২৮ কোটির নতুন ঋণের ফাঁদ বিআরটিসির ব্যালেন্স শিট বিশ্লেষণ করলে শিউরে উঠতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির ঋণ ও মূলধনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে অভাবনীয় ৩৫ : -২৩৫ এ! ফিন্যান্সের ভাষায় মূলধন যখন নেতিবাচক হয়ে যায়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানকে বলা হয় 'টেকনিক্যালি দেউলিয়া'। এই ধারাবাহিক লোকসানের জেরে প্রতিষ্ঠানটির নিট নেতিবাচক রিজার্ভ এখন ২,৪১২.৫৫ কোটি টাকার এক বিশাল খাদের রূপ নিয়েছে ।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো— এই খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও বিআরটিসির বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে মেগা কেনাকাটার নামে বিশাল কমিশন বাণিজ্যের অকাট্য দালিলিক প্রমাণ মিলেছে। ব্যালেন্স শিট অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি যখন চরম দেউলিয়া, তখন নতুন করে ইডিপিসিএফ ফান্ডের ঋণে মোট ৮২৮.৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৪০টি নতুন সিএনজি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস (১৪০টি সিটি বাস ও ২০০টি ইন্টারসিটি বাস) কেনার মেগা প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে।