• ঢাকা
  • শুক্রবার , ৩১ জুলাই ২০২৬ , রাত ০২:৩১
ব্রেকিং নিউজ
হোম / অনুসন্ধান ও অনিয়ম
রিপোর্টার : মো. মোশারফ হোসাইন
প্রশাসনিক ব্যর্থতায় দেউলিয়া ছাতক সিমেন্ট, বন্ধ কারখানায় ২০০ কোটি টাকার ভূতুড়ে ব্যয়

প্রশাসনিক ব্যর্থতায় দেউলিয়া ছাতক সিমেন্ট, বন্ধ কারখানায় ২০০ কোটি টাকার ভূতুড়ে ব্যয়

প্রিন্ট ভিউ

দেশের বেসরকারি সিমেন্ট কোম্পানিগুলো যখন নতুন নতুন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যাবহার করে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে, তখন চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অপচয় ও অব্যবস্থাপনায় ডুবে হাজার কোটি টাকার লোকসানের বোঝা টানছে দেশের প্রাচীনতম রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ‘ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড’ (সিসিসিএল)। কারখানাটিতে দীর্ঘদিন ধরে কোনো বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রয় না থাকলেও (Turnover = ৳০) কেবল কাগজ-কলমে বন্ধ কারখানার পেছনেই এক বছরে খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা!

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন এই প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে এসব চাঞ্চল্যকর ও বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে।

যৌথ অডিট ফার্ম এস কে বারুয়া অ্যান্ড কোং এবং কে এম আলম অ্যান্ড কোং কর্তৃক সম্প্রতি প্রস্তুতকৃত অর্থ বিভাগের প্রকাশিত ২৪-০৬-২০২৬ তারিখের  প্রতিবেদনের ‘Basis for Qualified Opinion’ অংশে অডিটররা সরাসরি নোট ৫.০২ ও নোট ৬.০০ সহ প্রধান ৫টি খাতের হিসাবগত অসংগতি ও আইনি ব্যত্যয় চিহ্নিত করেছেন। এসব মারাত্মক অনিয়মের কারণে তারা আর্থিক বিবরণীতে 'শর্তযুক্ত মতামত' (Qualified Opinion) প্রদান করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটি চরম আর্থিক সংকট ও অস্তিত্বের ঝুঁকিতে (Going Concern Threat) পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন।

খরচের পাহাড়, উৎপাদন শূন্য

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছাতক সিমেন্টের কোনো পণ্য বিক্রি বা রাজস্ব আয় (Turnover) হয়নি। অথচ এই এক বছরে 'বিক্রিত পণ্যের উৎপাদন খরচ' (COGS) দেখানো হয়েছে ১৯৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি (গ্যাস) বাবদ ২১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা এবং বিদ্যুৎ বিল বাবদ ২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা খরচ করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে শ্রমিকের বিলে; কারখানা চালুই নেই, অথচ অডিট রিপোর্টে 'অন্যান্য ওভারহেড' খাতের অধীনে কেবল 'অস্থায়ী শ্রমিক' (ক্যাজুয়াল লেবার) বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি। উৎপাদনহীন কারখানায় এত গ্যাস-বিদ্যুৎ ব্যবহার ও ভূতুড়ে শ্রমিকের নামে টাকা তোলা প্রশাসনিক তদারকির চরম ব্যর্থতা ও দুর্নীতি নির্দেশ করে।

সরকারি লোকসান বনাম বেসরকারি সাফল্য: কারণ প্রশাসনিক ব্যর্থতা:

সিমেন্ট শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, যেখানে বসুন্ধরা, শাহ, প্রিমিয়ার বা হাইডেলবার্গের মতো বেসরকারি কোম্পানিগুলো আধুনিক ‘ড্রাই প্রসেস’ ও ভিআরএম প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন খরচ কমিয়ে লাভ করছে, সেখানে সিসিসিএল এখনও পুরনো ও অকার্যকর ‘ওয়েট প্রসেস’ প্রযুক্তিতে আটকে ছিল। কারখানাটিকে ‘ড্রাই প্রসেস’-এ রূপান্তরের প্রকল্প বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বছরের পর বছর কাজ ঝুলে রয়েছে। ফলে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রেখে কোটি কোটি টাকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ ও মেইনটেন্যান্স খরচ জুগিয়ে চালানো হচ্ছে।

অডিট আপত্তি ও অডিটরদের চিহ্নিত সুনির্দিষ্ট নোটসমূহ:

অডিটররা তাঁদের প্রতিবেদনে মূলত যেসব হিসাব ও নোটের ওপর আপত্তি তুলেছেন: নোট ৫.০২ ও ৬.০০ (অনাদায়ী ৩২২ কোটি টাকা): অডিট রিপোর্টের নোট ৫.০২ অনুযায়ী বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের পাওনা ১২ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং নোট ৬.০০ অনুযায়ী বন্ধ থাকা কমোড়া লাইমস্টোন মাইনিং প্রজেক্টের (টিএলএমপি) পাওনা ৩২ কোটি ৮ লাখ টাকা (মোট ৩২২ কোটি ২ লাখ টাকা) আর কখনোই আদায় সম্ভব নয়। অডিটরদের আপত্তি সত্ত্বেও এই মৃত পাওনাকে অবলেখন (Write-off) না করে কাগজে-কলমে 'চলতি সম্পদ' হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

নোট ১২.০০ (সি) (ড্যানিডা অনুদানে কৃত্রিম ঋণ): সূচনালগ্ন থেকে 'ড্যানিডা' থেকে প্রাপ্ত ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার অনুদানকে (Grant) অডিটরের বারংবার আপত্তি সত্ত্বেও ভুলভাবে ‘বৈদেশিক ঋণ’ হিসেবে দেখিয়ে দায় বাড়িয়ে রাখা হয়েছে এবং ইক্যুইটি কম দেখানো হয়েছে।

নোট ৭.০২ (ভ্যাট রিবেটের ক্ষতি): কারখানা বন্ধ থাকায় আর কখনোই ফেরত না পাওয়া ২৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকার ভ্যাট রিবেটকে ক্ষতি হিসেবে বুক না করে 'অগ্রিম সম্পদ' হিসেবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

নোট ১০.০০ (আইনি ও প্রশাসনিক গাফিলতি): কোম্পানি আইনের ৩৬ ধারা লঙ্ঘন করে বহু বছর ধরে শেয়ারহোল্ডারদের আপডেটেড তালিকা (Schedule-X) যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরে (RJSC) জমা দেয়নি প্রশাসন, যা মূলধনের আইনি ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।

দেউলিয়া হওয়ার পথে সিসিসিএল:

বিপুল পরিমাণ লোকসানের ফলে ছাতক সিমেন্টের মূলধন ও সংরক্ষিত তহবিল পুরোটাই হারিয়ে গেছে। অডিট তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকায়। ফলে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের ইক্যুইটি ঋণাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে মাইনাস (-) ৭ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বর্তমানে নিজস্ব আয়ে ঋণ বা সুদ পরিশোধের কোনো সক্ষমতাই প্রতিষ্ঠানটির নেই।

এছাড়াও ‘এম/এস সম্পা অ্যান্ড সানস’ নামের এক ট্রেডার্সকে জামানত ছাড়াই বাকিতে পণ্য দেওয়ার প্রশাসনিক শিথিলতার কারণে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে জালিয়াতির মামলা (মামলা নং ১৭/২০২২) চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মত:

আর্থিক ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন প্রযুক্তি আনলেই এই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাঁচানো সম্ভব নয়। কারখানা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে ২০০ কোটি টাকার ভূতুড়ে ব্যয় দেখানো হলো—তা খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ 'ফরেনসিক অডিট' পরিচালনা করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রশাসনিক গাফিলতি ও অপচয়ের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

ক্রাইম

আরও পড়ুন