• ঢাকা
  • বৃহঃস্পতিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ভোর ০৪:৪৩
ব্রেকিং নিউজ
হোম / বাণিজ্য
রিপোর্টার : মিজানুর রহমান লিটন
বাংলাদেশে ১০ বছরের দীর্ঘ ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল: আলজেরীয় ব্যবসায়ী ইয়াসিন

বাংলাদেশে ১০ বছরের দীর্ঘ ব্যবসায়িক সম্পর্ক বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল: আলজেরীয় ব্যবসায়ী ইয়াসিন

প্রিন্ট ভিউ

বাংলাদেশে প্রায় এক দশক ধরে সফলভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনা করে আসা আলজেরীয় ব্যবসায়ী মুহাম্মদ ইয়াসিন বেলগাসেমী (Muhammad Yacine Belgacemi) সম্প্রতি ফ্রান্সের ভিসা না পাওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। আলজেরিয়ার আলজিয়ার্সে জন্ম নেওয়া বেলগাসেমী তাঁর ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার শুরু করেন স্বদেশে, যা পরবর্তীতে চীন ও বাংলাদেশে সম্প্রসারিত হয়। গত ১০ বছরে তিনি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সুদৃঢ় ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। আলজেরিয়ার বাজারে বাংলাদেশী পোশাক পণ্যের সুযোগ তৈরিতেও রয়েছে তাঁর বিশেষ ভূমিকা।

সম্প্রতি দ্য ইনভেস্টর (The Investor)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বেলগাসেমী বাংলাদেশে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যবসার অভিজ্ঞতা, বাণিজ্য প্রতিশ্রুতি এবং ভিসা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক জটিলতা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

দ্য ইনভেস্টর: বাংলাদেশে আপনার ব্যবসায়িক যাত্রা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।

ইয়াসিন বেলগাসেমী: আমি প্রায় ১০ বছর ধরে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সোর্সিং, উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ—বিশেষ করে টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এই সময়ে স্থানীয় সরবরাহকারী, প্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়িক সহযোগীদের সাথে আমার একটি দীর্ঘমেয়াদী পেশাদার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ আমার আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কৌশলের এক অপরিহার্য অংশ।

দ্য ইনভেস্টর: বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

ইয়াসিন: বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। এখানকার দক্ষ জনবল, শক্তিশালী উৎপাদন সক্ষমতা, সমৃদ্ধ টেক্সটাইল ও পোশাক খাত এবং প্রতিষ্ঠিত সাপ্লাই চেইন বড় ধরনের শক্তি। তবে আরও বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নীতিগত ধারাবাহিকতা ও পূর্বাভাসযোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

দ্য ইনভেস্টর: আপনি নিয়মিত ট্যাক্স, ভ্যাটসহ সরকারি সব চার্জ পরিশোধ করে আসছেন। ব্যবসায়িক নীতি মেনে চলাকে (Compliance) আপনি কতটা গুরুত্ব দেন?

ইয়াসিন: আমার বিশ্বাস, যেকোনো দেশে ব্যবসা করতে গেলে সেখানকার আইন-কানুন মেনে চলা একজন ব্যবসায়ীর প্রধান দায়িত্ব। আমি বছরের পর বছর ধরে রাজস্ব ও আইনগত বাধ্যবাধকতা পূর্ণ করেই বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। পাশাপাশি ব্যবসায়িক জটিলতা দেখা দিলে বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দ্য ইনভেস্টর: আপনার সাম্প্রতিক ফরাসি (ফ্রান্স) ভিসা আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে?

ইয়াসিন: স্বভাবতই আমি হতাশ হয়েছি। একজন আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীর জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। চুক্তি, অংশীদারিত্ব রক্ষা বা বাণিজ্যিক বৈঠকের জন্য সফর আবশ্যক। আমি অবশ্যই ভিসা কর্তৃপক্ষের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করি। তবে আমার উদ্বেগ হলো—আমি যে সকল নথি জমা দিয়েছিলাম, তার ভিত্তিতে আমার প্রকৃত ব্যবসায়িক অবস্থান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়েছে কি না।

দ্য ইনভেস্টর: ভিসা প্রত্যাখ্যানের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আপনি ফ্রান্সে যাওয়ার পর বাংলাদেশে নাও ফিরতে পারেন। এই মূল্যায়নকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ইয়াসিন: এ ধরনের মূল্যায়ন মেনে নেওয়া কঠিন। আমি প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছি। এখানে আমার চলমান অপারেশন, কোটি টাকার বিনিয়োগ, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পেশাগত সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতা রয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ফেলে আমার অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকতে পারে না।

দ্য ইনভেস্টর: আপনি কি মনে করেন আপনার ১০ বছরের ব্যবসায়িক ইতিহাস ও বাংলাদেশের সাথে সুদৃঢ় সম্পর্ক ভিসার সিদ্ধান্তে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি?

ইয়াসিন: কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণভাবে ফাইল কীভাবে মূল্যায়ন করে তা বলা কঠিন। তবে একজন আবেদনকারীর আর্থিক সক্ষমতা, ট্যাক্স-ভ্যাট রেকর্ড, দীর্ঘ ১০ বছরের ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা ও স্থানীয় দায়বদ্ধতার দলিলগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা উচিত বলে আমি মনে করি।

দ্য ইনভেস্টর: এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা কি বাংলাদেশে আপনার ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ বা সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে?

ইয়াসিন: একটি বিচ্ছিন্ন বা তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার সামগ্রিক মূল্যায়ন বদলে যাবে না। এখানকার মানুষের সম্ভাবনা ও ব্যবসা খাত নিয়ে আমি এখনো অত্যন্ত আশাবাদী। আমার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তসমূহ এদেশের পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সুযোগের ওপর নির্ভর করেই গৃহীত হবে।

দ্য ইনভেস্টর: বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় 'বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' (BIDA)-র কী ধরনের ভূমিকা থাকা উচিত?

ইয়াসিন: বিদেশী বিনিয়োগ আসার পর 'পোস্ট-ইনভেস্টমেন্ট' সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, সরকারি সংস্থাগুলোর সাথে সমন্বয় তৈরি এবং যৌক্তিক প্রয়োজনে বিদেশী মিশন বা দূতাবাসগুলোর সাথে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ তৈরিতে বিডা (BIDA) আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

দ্য ইনভেস্টর: বাংলাদেশে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

ইয়াসিন: বাংলাদেশের টেক্সটাইল, পোশাক ও রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। আমি স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের সাথে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব জোরদার করা এবং বাংলাদেশী পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। ১০ বছর অতিক্রম করার পর বাংলাদেশ এখন কেবল আমার ব্যবসার স্থান নয়, এটি আমার গ্লোবাল বিজনেস স্ট্র্যাটেজির মূল কেন্দ্রবিন্দু।


বাণিজ্য

আরও পড়ুন