ময়মনসিংহ সদর উপজেলা ভূমি অফিসে জালিয়াতির ‘মাস্টারমাইন্ড’ হয়ে উঠেছেন সহকারী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আবুল কালাম আজাদ। ভুয়া রেকর্ড ও হোল্ডিং তৈরি করে জমি নামজারি, সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায়, এমনকি অফিসে নিজস্ব বাহিনী বসিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় কেন্দ্র পরিচালনার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। নথিতে জালিয়াতি প্রমাণিত হয়ে নামজারি বাতিল হলেও রহস্যজনক কারণে পার পেয়ে গেছেন এই কর্মকর্তা। সম্প্রতি অনিয়ম ও ঘুষের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক সাংবাদিক তাঁর ক্যাডার বাহিনীর হাতে লাঞ্ছিত ও হামলার শিকার হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আশু হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সদর ভূমি অফিসে নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ ছাড়া নামজারি (খারিজ) কিংবা জমি সংক্রান্ত অন্যান্য কাজ এগোয় না। সেখানে একটি শক্তিশালী দালালচক্র গড়ে তোলা হয়েছে, যাদের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করতে বাধ্য হন সেবাগ্রহীতারা। চাহিদামতো অর্থ না দিলে ফাইল আটকে রেখে মাসের পর মাস ঘোরানো নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
তার জালিয়াতি ও অপকর্মের চিত্র শুধু সদর হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, আবুল কালাম আজাদ তাঁর পূর্ববর্তী কর্মস্থলে থাকাকালে নথিতে জমির প্রকৃত কোনো অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া হোল্ডিং তৈরি করে এক ব্যক্তির নামে নামজারি মঞ্জুর করান। পরবর্তীতে এই চরম জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ উক্ত নামজারি বাতিল ঘোষণা করে। তবে অপরাধ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় বা ফৌজদারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
সর্বশেষ এশিয়ান টেলিভিশনের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি মো. আবুল মনসুরের ওপর হামলার ঘটনায় ناয়েব কালামের বেপরোয়া রূপ প্রকাশ পায়। সূত্রে জানা গেছে, এক বয়স্ক নারীর কাছ থেকে নামজারির কথা বলে ২৪ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে যান ওই সাংবাদিক। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন নায়েব কালাম। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি প্রকাশ্যে সাংবাদিককে ‘দড়ি দিয়ে বাঁধার’ নির্দেশ দেন। মুহূর্তের মধ্যে তাঁর কার্যালয়ের পিয়ন ও ক্যাডার অনুসারীরা ওই সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়, তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে এবং মোবাইল ফোন ভেঙে দেয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার দাবি করে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এ ছাড়া কার্যালয়ে বহিরাগত কিশোর গ্যাং ও ক্যাডার বাহিনী দিয়ে মহড়া দেওয়া, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের মতে, অফিসের ভেতরে নিজস্ব সন্ত্রাসী বলয় তৈরি করে তিনি একপ্রকার একক রাজত্ব গড়ে তুলেছেন।
গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকাশের পরও জেলা প্রশাসন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড কার্যালয় নীরব ভূমিকা পালন করায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা জালিয়াতির সহযোগীদের রক্ষা করার নামান্তর বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ভুক্তভোগীদের দাবি, জালিয়াতির মূল হোতা আবুল কালাম আজাদসহ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সবার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে অবিলম্বে দুদকের তদন্ত শুরু করা দরকার।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে নায়েব আবুল কালাম আজাদের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) মতামত নেওয়ার জন্য ফোন করা হলে তিনিও সাড়া দেননি।
তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।